Sunday , October 21 2018

মা বলতেন, আমার দুই ছেলে

মা বলতেন- চট্টগ্রামের জুবলি রোডে আমরা পাশাপাশি থাকতাম। আমি তখন ক্লাস এইট-নাইনে পড়ি। আমার চেয়ে বয়সে একটু বড়ই হবে বাচ্চু। ১৯৭৭ সালে প্রথম ব্যান্ড ‘রিদম ৭৭’ করি। চট্টগ্রামের হেন জায়গা নেই, যেখানে আমরা বাজাইনি।

দুই বছর পর করলাম ‘ফিলিংস’। বাচ্চুও যোগ দেয়। আমরা তখন ইংরেজি ইনস্ট্রুমেন্টালই বেশি করতাম। ‘ফিলিংস’ প্রথম কাজ পায় আগ্রাবাদ হোটেলে। ওখানে বিদেশি অতিথিরাই বেশি থাকত।

দীর্ঘদিন এই হোটেলে বাজিয়েছি। সেই সময় থেকেই আসলে বাচ্চু ওয়েস্টার্ন ঘরানার গিটার বাজানো শুরু করে। রাত করে ঘরে ফিরতাম। মা রান্না করে আমাদের খাওয়াতেন। মা বলতেন, আমার দুই ছেলে।

মাকে এখনো বাচ্চুর মৃত্যুর খবরটা জানাইনি। মাঝেমধ্যে প্রায়ই ফোন করে ও বলত—দোস্ত, মাসিমাকে দেখতে আসব। আমাদের সম্পর্ক এমন ছিল যে আমরা পরস্পরকে ‘মামা’ বলে ডাকতাম।

আমি ঢাকায় চলে এলে ও তখন ‘সোলস’-এ গিটারবাদক হিসেবে যোগ দেয়। এরপর বাচ্চু ঢাকায় চলে এলো। আমরা তখন একসঙ্গে থাকতাম। এমনকি এক খাটেও ঘুমিয়েছি। এভাবেই তিন-চার বছর কাটিয়েছি।

সম্ভবত ১৯৮৫ সালে আমরা একসঙ্গে শেষবার বাজিয়েছিলাম। সেটা ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠান। এরপর বাচ্চু একদিন বলল—দোস্ত, একটা ব্যান্ড করতে চাই। একটা বাসা নিয়ে দে না।

আমার বাসার পাশেই একটা বাসা নিয়ে দিলাম। সেটা এতটাই কাছে ছিল যে জানালা দিয়েই কথা বলা যেত। এরপর বাচ্চুর প্রেম, বিয়ে। বিয়ের বাজার সদাই, বরের গার্জিয়ান হিসেবে যাওয়া—সব কিছুই করেছি আমি।

৪০ বছর ধরে সংগীতাঙ্গনে একসঙ্গে কাজ করলে কত স্মৃতিই না জমা হয়! সংগীতশিল্পী হিসেবে সে এককথায় অসাধারণ। নিজেকে সব সময় আপগ্রেড করতে চাইত।

কিছুদিন আগে একটা অনুষ্ঠানে শেষবারের মতো দেখা হয়েছিল। তখন বাচ্চু বলেছিল—দোস্ত, শেষ পর্যন্ত হয়তো আমাদের একজন আরেকজনকেই কাঁধে নিতে হবে। তাই আমাদের সম্পর্কটা আরো নিবিড় হওয়া দরকার।’

আইয়ুব বাচ্চুর মতো তারাও কি স্বজনদের পাশে না পেয়ে একা বাসায় মরে পড়ে থাকবেন?

চলে গেলেন আইয়ুব বাচ্চু। দুই সন্তান, মেয়ে ফায়রুজ সাফা অস্ট্রেলিয়া ও ছেলে তাজওয়ার কানাডায় থাকেন। মৃত্যুকালে বাচ্চুর পাশে কেউ ছিলেন না।স্ত্রী চন্দনাও সন্তানদের কাছে বিদেশে বেশিরভাগ সময় কাটান।

ফলশ্রুতিতে আইয়ুব বাচ্চু একাকি জীবন কাটাতেন। বাইরে থেকে মানুষ না বুঝলেও এখন শোনা যাচ্ছে তিনি কতটা অসুস্থ ছিলেন। গান নিয়ে থাকতেন, সময় পেলে ছুটে যেতেন সন্তানদের কাছে।

প্রয়াত জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর ছেলে ও মেয়ে আগামীকাল কানাডা থেকে দেশে ফেরার পর শিল্পীর দাফন ও নামাজে জানাজার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। অপেক্ষা সন্তানদের। হয়তো অপেক্ষায় থাকতেন আইয়ুব বাচ্চুও।

সন্তানরা উচ্চ শিক্ষায় বিদেশ যায়। তারকাদের অর্থ প্রতিপত্তি যাই হোক। একটা সময় আপন মানুষের খুব অভাব দেখা যায়। অনেকেই সন্তানদের তখন পাশে পায় না। একাকিত্বে ভোগে।

হয়তো বাবা মা মুখ ফুটে বলতে পারে না তুই সব ছেড়ে আমার কাছে চলে আয়। কিন্তু দরকার কী তাদের হয় না? মন কাঁদে না? অসুস্থ বাবা-মাও অনেক সময় কাছে পায় না তাঁদের সন্তানদের।

দিলারা জামানের বড় মেয়ে তানিরা, আমেরিকায় থাকেনে পেশায় ডাক্তার। ছোট মেয়ে যোবায়রা কানাডায় রয়েছে। যোবায়রা পেশায় আইনজীবী। স্বামী চলে গিয়েছেন পরপারে। এখন একাকিত্বের জীবন।

কেমন কাটান সেই জীবন? বললেন দিলারা জামান, ‘মাঝেমধ্যেই আমি খুবই ডিপ্রেশনে ভুগি। সে জন্যই অভিনয় করে চলছি। কাজের মধ্যে থাকলেই সব কিছু ভুলে থাকি। যখন ঘরে আসি তখন আবার একাকীত্ব ধরে বসে। মনে হয় আমার কিছুই করার নেই! বিরাট একটা শূণ্যতা জেঁকে ধরে বসে।

তখন মনকে আশ্বাস দিই এটাই স্বাভাবিক। আর আমার নিজের কাজ নিজেকেই সব করতে হয়। আমি বাসার জন্য কাজের লোক রাখি না। যতদিন শরীরে শক্তি আছে ততদিনই করে যাব।

আর এখনকার সময় নিজের নিরাপত্তার কথাসহ সবকিছুই মাথায় রেখে চলতে হয়। স্বাভাবিক জীবনযাপন করেই মরতে চাই, অপঘাতে নয়। পড়াশোনা করি। কিছুটা মানুষ ও সমাজের জন্য কাজ করার চেষ্টাও করি।’

বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা খ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের জীবনে। ৫ সন্তানের জনক ছিলেন। জীবনের সকল আয়, ব্যয় করেছেন সন্তানদের পেছনে। বড় ছেলে সুইডেন, বাকী ৩ ছেলে ও ১ কন্যা আমেরিকায়। একা বাসায় ধুকে ধুকে মারা গেলেন। ১টি সন্তান ও এলেন না বাবাকে দেখতে। জীবনের শেষ বেলাতেও অভিনয় করতে হয়েছে পেটের তাগিদে।

২ সন্তানের জনক সাহসী কবি আল মাহমুদ। বনানীর বাড়ী বিক্রী করে সন্তানদের বিদেশে পাঠান। আর ফিরে আসেনি আদরের দুলালেরা। কবি আজ একা বিছানায় পড়ে রয়েছেন। দেখার কেউ নেই। এক সময় চলে যাবেন না ফেরার দেশে।

ববিতার একমাত্র ছেলে অনিক কানাডাতে পড়াশুনা শেষ করে সেখানেই স্থায়ী। দেশে খুব কম আসা হয়। ববিতার বিয়ে হয়েছিল ব্যবসায়ী ইফতেখারের সঙ্গে। সেই বিয়ে টিকেছিল মাত্র দুই বছর। ববিতা একা থাকেন। মাঝেমধ্যে ছেলের কাছে গিয়ে থাকেন।

রাইসুল ইসলাম আসাদের বছরের প্রায় অর্ধেক সময়ই আমেরিকায় থাকতে হয়। কারণ সেখানে তার স্ত্রী তাহিরা দিল আফরোজ ও একমাত্র মেয়ে ডা: রুবায়না জামান থাকেন। তাই স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে সময় কাটাতে প্রায় সময়ই রাইসুল ইসলাম আসাদকে আমেরিকায় যেতে হয়। কিন্তু মন তো টেকে না। ফিরে আসতে হয় বাংলাদেশে, অভিনয়ের মঞ্চে।

সৈয়দ হাসান ইমাম ও লায়লা হাসান দম্পতির তিন সন্তানের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে ভিকারুননেসায় শিক্ষকতা করে আর মেজ মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন শিক্ষকতা করার পর কানাডা চলে গিয়েছে।

ছোট ছেলে থাকেন আমেরিকাতে সেখানে সে পড়াশোনা করার পাশাপাশি শিক্ষকতা করে। ৮৩ বছর বয়স্ক সৈয়দ হাসান ইমামও মাঝেমধ্যে বলেন, ‘সন্তানদের খুব মিস করি। একসঙ্গে আর থাকা হবে না! মেয়ে থাকে জামাইর সঙ্গে। আমরা তো সেই দুই বুড়ো-বুড়ি থাকি মগবাজারের বাসায়।’

বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্রের অনন্য একজন তপন চৌধুরী। এখন নিয়মিত কানাডায় বসবাস করলেও দেশের টানে, গানের টানে স্ত্রী শর্মিলা চৌধুরী ও একমাত্র সন্তান সত্যমকে ছেড়ে প্রায়ই ঢাকা চলে আসেন। তিনি একা থাকতে পারবেন না বলে কানাডাতেই স্থায়ী হয়েছেন। সন্তানের জন্য নিজেকে কানাডা স্থায়ী করেছেন। সবাই তো তা পারে না।

কুমার বিশ্বজিতের একমাত্র সন্তান কুমার নিবিড় পড়াশুনা করেন যুক্তরাষ্ট্রে। মিশা সওদাগরের বড় ছেলে ওয়ালিদ হাসানও পড়ছেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে। ছোট ছেলে ওয়াশকুরনী হাসান ঢাকার স্কলাস্টিকায়। স্ত্রী

জোবায়দা রব্বানী মিতা শিক্ষকতা করেন। সন্তানের টানে প্রায় প্রায় ছুটে যান বিদেশে। একদিন এই বাবা তো বৃদ্ধ হয়ে যাবে। সন্তান কি ফিরবে তখন? নাকি আইয়ুব বাচ্চুর মত একাকি পাড়ি দিতে হবে ওপাড়?

Facebook Comments