Saturday , August 25 2018

হটাত কেন দাম কুমেছিল কোরবানির গরুর? শুনুন গরুর ব্যাপারীর মুখেই

অতি লোভেই ডুবেছেন- এবার কোরবানির ঈদের আনন্দ স্পর্শ করেনি গরু ব্যাপারীদের। গাবতলীসহ নগরীর বিভিন্ন হাটে লোকসান গুনতে হয়েছে তাদের। সারা দেশের চিত্রও প্রায় একই।

কেউ পাঁচ লাখ, কেউ ১০ লাখ, কেউ আবার ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনেছেন। মূলত হাটে যে ব্যাপারী যতো বেশি গরু তুলেছেন তার লোকসান হয়েছে ততো বেশি।

যেমন চুয়াডাঙার শাহিন ব্যাপারী হাটে ৪০টি গরু তুলেছিলেন এবার। এরমধ্যে ২০টি গরু বিক্রি করেছেন চার লাখ টাকা লোকসানে। আরও ২০টি গরু রয়ে গেছে। দেশের মাংসের চাহিদা পূরণে কসাইদের কাছে বিক্রি করলে আরও পাঁচ লাখ টাকা লোকসান হবে বলে জানান তিনি।

শাহিন ব্যাপারী বলেন, ১৫ বছর ধরে গরুর ব্যাবসা করি। গত ১২ বছরে ব্যাপারীরা এতো ধরা খায়নি। মানুষ এবার গরু কম কোরবানি দিয়েছে। আমার মনে হয় মানুষের হাতে টাকা নেই।থাকলে আমার এমন অবস্থা হতো না।

বৃহস্পতিবার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর গাবতলী স্থায়ী পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, ট্রাকে অবিক্রিত গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছেন ব্যাপারীরা। মূলত অতি লোভ বা লাভ করতে গিয়েই ব্যাপারীরা ধরা খেয়েছেন বলে জানায় গাবতলী স্থায়ী পশুর হাট কর্তৃপক্ষ।

গরু ব্যাপারীরা এখনও কেউ কেউ হাটেঈদের আগে রোববার (১৯ আগস্ট) গাবতলী পশুর হাটে প্রচুর ক্রেতা ছিল। কিন্তু ৫০ হাজার টাকা দামের গরুর দাম ১ লাখ টাকার উপরে চেয়ে বসেন ব্যাপারী।

ফলে ক্রেতারা অনেকে গরু কোরবানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। আকাশচুম্বী দাম চেয়ে বেশি লাভের আশায় গরু ছাড়েননি ব্যাপারীরা।

কোরবানির ঈদের দু’দিন আগে চড়া দামে গরু বিক্রি হয়েছে। ব্যাপারীরা মনে করেছিলেন শেষ দিন গরুর দাম আরও চড়া হবে। কারণ গত কোরবানির ঈদে এমনটি হয়েছিল।

অনেক ক্রেতা গরুই পাননি। কিন্তু এবার হয়েছে উল্টো। যারা কেনার তারা আগেভাগে কিনে ফেলায় শেষ দিনে গরু ছিল চাহিদার চেয়ে বেশি। ফলে ব্যাপারীদের আশায় ‘গুড়ে বালি’ হয়েছে।

গাবতলী হাটে এখনও গরুগাবতলী হাট পরিচালনা কমিটির সদস্য সানোয়ার হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, আমি ৩০ বছর গাবতলী পশুর হাটে কমিটিতে আছি। বিগত ১২ বছর এমন কম গরু বেচাকেনা আমি দেখিনি।

কথায় আছে অতি লোভে তাঁতী নষ্ট। ব্যাপারীরা বেশি খাইতে গিয়েই ধরা খাইছে। ৫০ হাজার টাকার গরুর দাম চেয়েছে এক লাখ টাকা। ফলে ক্রেতাদের মনের মধ্যে বড় ধাক্কা লাগছে। ১৯ আগস্ট প্রচুর ক্রেতা নামছে। কিন্তু ওইদিন গরুর দাম শুনে ক্রেতারা হাট থেকে চলে গেছেন, আর ফেরেননি।

ব্যাপারীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এখনও টুকটাক গরু বিক্রি হচ্ছে। ব্যাপারীরা এখন ঠিকই ১ লাখের গরু ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। তাহলে এখন কীভাবে কম দামে গরু বিক্রি করছেন তারা। আসলে লাভ করারও একটা সীমা আছে। অতি লোভেই ডুবেছেন গরুর ব্যাপারীরা।

প্রাণিসম্পদ অধিফতর সূত্র জানায়, ঢাকায় গরু, ছাগল ও মহিষ মিলে মোট ২০ লাখ পশুর চাহিদা থাকে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পশু সরবরাহ করা হয়েছে।

গতবছর শেষ মুহূর্তে কোরবানির পশুর দাম চড়া হয়। এ জন্যই এবার সরবরাহ বেড়েছে। কোরবানির ঈদে লম্বা ছুটি। ফলে অনেক মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। এই দু’টি কারণেই ঘটনা এমন হয়েছে।

ঢাকা থেকে গরু ফিরে যাওয়া প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, এবার ঢাকায় বেশি পশু সরবরাহ হয়েছে। এছাড়াও লম্বা ছুটি থাকায় মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন বেশি। যে কারণে কোরবানির পশু ঢাকা থেকে ফিরে গেছে।

তিনি আরও বলেন, এবার আমরা প্রমাণ করলাম কোরবানির ঈদে ভারতের গরুর প্রয়োজন নাই। ভারত ছাড়াই দেশীয় গরুতে কোরবানি সম্ভব। ভারত গরু না দেওয়ায় বাংলাদেশ লাভবান হবে। ভারতীয় গরু না আসলে দেশে গরু উৎপাদনও বাড়বে।

ছাগলের চামড়া ছুঁয়েও দেখছেন না আড়তদাররা

কোরবানি পশুর লবণছাড়া কাঁচা চামড়ার বাজার শুরু থেকেই নিম্নমুখী। অনেক ব্যবসায়ী চামড়া কিনে পড়েছেন মহাবিপদে। কোথাও দাম না পেয়ে নিয়ে এসেছেন ঢাকার পাইকারি বাজার পোস্তায়। তাতেও কাজ হচ্ছে না।

দাম কম হলেও গরুর চামড়ার তবু কিছুটা গতি হয়েছে। কমবেশি যাইহোক ব্যবসায়ীরা পেয়েছেন। কিন্তু যারা ছাগলের চামড়া কিনেছিলেন তাদের অবস্থা করুণ। চামড়া কেনা দূরের কথা, আড়তদাররা ছুঁয়েও দেখছেন না বলে জানান মোশাররফ হোসেন নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

লালবাগের পোস্তা চামড়াপল্লীতে ছাগলের চামড়া কিনে তাতে লবণ মাখছিলেন মোশাররফ হোসেন ও তার কর্মীরা। ছাগলের চামড়ার দর কেমন জানতে চাইলে বলেন, দাম জিগায়া কি করবেন? নিবেন? এখন কেউ জিগায় না। প্রতিটি চামড়ায় প্রায় ৩০-৪০ টাকার লবণ লাগছে। এই চামড়া এখন কি করবো? রাস্তায় ফেলে দিয়ে যাবো?

মোশররফ হোসেন বলেন, ছাগলের প্রতিটি চামড়ায় ৪০ টাকা করে লোকসান। এই ব্যবসা আর করবো না।

বড় আকারের একটি খাসির চামড়া ৪০ টাকা দাম করছেন এক আড়তদার। চামড়াটি মহল্লা থেকে ৮০ টাকায় কিনেছেন মোশাররফ। এবার ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মাদরাসার ছাত্ররা যে চামড়া সংগ্রহ করেছিল তার সিংহভাগই বিক্রি হয়নি।

বৃহস্পতিবার (২৩ আগস্ট) দুপুর পর্যন্ত পোস্তায় চামড়া ঢুকতে দেখা গেছে। দেশের অন্য জেলা থেকেও চামড়া আসছে। শুক্রবার (২৪ আগস্ট) পর্যন্ত লবণছাড়া চামড়া পোস্তায় আসবে। তাই পড়তি এই দাম আরও পড়বে বলেই দাবি আড়তদারদের।

আড়তদার সমীর উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, আসলে চামড়ার সিন্ডিকেট নিয়ে যে কথা হচ্ছে সেটা আদৌ ঠিক না। আন্তর্জাতিক বাজারেই দাম কম। চামড়ার চাহিদা না থাকলে আমরা কিনে কি করবো। আর সিন্ডিকেট যদি হয়ে থাকে সেটা ট্যানারি মালিকরা করে। তাদের কারণেই চামড়ার এই দুরাবস্থা।

তার সঙ্গে একমত আড়তদার সামসুদ্দিনও। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আমরা এখন যে চামড়া কিনেছি সেগুলো ট্যানারি মালিকরা ন্যায্যমূল্য দেবে না। তারা মাল নিলেও টাকা পরিশোধ করে না। তাই ঝুঁকি নিয়েই চামড়া কিনছি।

ছাগলের চামড়ার দাম জানতে চাইলে আড়তদার সামসুদ্দিন বলেন, গরুর চামড়াই চলে না, ছাগলের চামড়া কে নেবে? ওগুলো এখন দেখার সময়ও নেই।

এজন্য পোস্তায় ছাগলের চামড়া নিয়ে অনেকেই মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। শেষ পর্যন্ত এই চামড়া বিক্রি হবে কিনা তা নিয়েও সন্দিহান তারা।

Facebook Comments