Monday , August 27 2018

‘কান ধরেছি জীবনে কখনো বিদেশে ঈদ করব না’

আমরা পাঁচ বোন ঈদের বিভিন্ন সময় কমবেশি রান্না করেছি। এক বোনের বিয়ে হয়ে গেলে অন্য বোন রান্না করতাম। খুব মজা লাগত! একেবারে খারাপ রাঁধি না- অনেকে প্রশংসাও করে। যাই হোক, আমরা খুলনার খালিশপুরে দৌলতপুর জুট মিলের কোয়াটারে থাকতাম। ওখানে অনেকগুলো পরিবার বাস করত। অনেক মজার একটি জায়গা ছিল।

ঈদের দিন সকালে আম্মার হাতের স্পেশাল খিচুরি খেতাম। মাশকালাইয়ের ডাল দিয়ে আম্মা খিচুরি রান্না করতেন। আমরা ভাই-বোনেরা তো খেতামই, বন্ধু-বান্ধবরাও এই খিচুরি খাওয়ার জন্য ঈদের দিন সকালে চলে আসত। আমার কাছে এটি খুবই স্পেশাল। এখনো মাঝেমধ্যে আম্মাকে রান্না করতে বলি।

ঈদের সময় আমার বড় দুই বোন সবসময় খেয়াল রাখতো- কোন জামা পরলে আমাদের বেশি সুন্দর লাগবে। কোন জামা কোন রঙের, কোন ডিজাইনের হলে ভালো হবে। এসব বিষয় নিয়ে আপারা রাত জেগে পরিকল্পনা করত। চাঁদ রাত এগুলো নিয়ে আলোচনা করে কাটাত। ভোর হলেই ঈদ- এটা ভেবে তখন ভীষণ আনন্দ লাগত। ঈদের এ বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিতো। এখনো ভুলতে পারি না। তবে ঈদের সময় বাবা-মায়ের কাছে কখনো জামাকাপড় ডিমান্ড করতাম না, অবশ্য আমরা কোনো ভাই-বোনই এটা করতাম না। বলা যায়, এদিক থেকে বাবা-মা খুব শান্তি পেয়েছেন।

ঈদের দিন আমরা দোকান দিতাম। অর্থাৎ দোকান থেকে সেভেন আপ, কোকাকোলা (কাচের বোতল) কিনে এনে কোয়াটারের এক পাশে দোকানের পসরা বসাতাম। এগুলো পরিচিতদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করতাম। এই স্মৃতিগুলো এখনো অনেক আনন্দ দেয়। তাছাড়া সাত চুন্নি, ক্রিকেট, ফুটবল খেলতাম। বর্ষার সিজনে কাদার মধ্যে ফুটবল খেলতে আমার খুব ভালো লাগত। খুব উপভোগ করতাম। ঈদে হাতে মেহেদি দেওয়ার রীতি নতুন নয়। আমরাও দিতাম, তবে আম্মা গাছ থেকে মেহেদির ব্যবস্থা করে দিতেন। আর ঈদের আগের রাতে ফুল চুরি করাটা আমাদের আনন্দের অন্য একটি অংশ ছিল। কোয়াটারেই এক কাকার বাসায় অনেক ফুল গাছ ছিল। সেখান থেকেই বেশি ফুল চুরি করতাম।

ছোটবেলার ঈদে সেলামি দেয়া-নেয়ার স্মৃতি তেমন মাথায় নেই। তবে এখন ঈদে সেলামি পাওয়ার চেয়ে দিতেই বেশি আনন্দ পাই। আসলে পাওয়ার চেয়ে দেয়ার প্রবণতা আমার মধ্যে একটু বেশি। জানি না আমার ভেতরে কেন এমন কাজ করে। ব্যান্ড দল গড়ার পর থেকে ঈদের দিন সবাই সবার সঙ্গে কথা বলি। ব্যান্ড দলের অন্য সদস্যদের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে আনন্দ ভাগ করে নিই। একটি ঈদের স্মৃতি কখনো ভুলব না। ২০১৫ অথবা ২০১৬ সালের ঘটনা।

এক ঈদে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম শো করতে। কোনো কারণে আমরা দেশে ফিরতে পারি নাই। ভেবেছিলাম, বিদেশে ঈদ করব ভালোই হবে। কিন্তু ঈদের সময় বাংলাদেশের যে চিত্র থাকে, সবাই যে আনন্দ, উল্লাস করে তার ছিটেফোটা ওখানে ছিল না। ওই ঈদের দিন কেঁদেছিলাম। বলেছিলাম, কেন এই ভুলটা করলাম? তারপর আমি কান ধরেছি জীবনে কখনো বিদেশে ঈদ করব না।

Facebook Comments