মাঝরাতে মানুষের ঘুম ভাঙে নানা কারণে। কিন্তু আমার জন্য সেদিনের কারণটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমার ঘুম ভাঙে প্রবল ঝাঁকুনিতে। ঘুম ভেঙে দেখি, বিছানা কাঁপছে। যেন কোনো থিম পার্কের ম্যাজিক কার্পেটে বসে আছি। হতবাক আমি খামচে ধরি তোশকের প্রান্ত। আমার স্ত্রীও উঠে বসেছে। ও-ই বলে, ভূমিকম্প!
সেটা বুঝতে সময় লাগে না। বাসার গৃহকর্মী বুকের মধ্যে আমাদের মেজো মেয়েকে জাপটে ধরে লম্বা করিডর দিয়ে ছুটে আসে। ভয়ে-আতঙ্কে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে সে। তাকে কোনোমতে শান্ত করা হয়। ভূমিকম্প হলে মানুষের মধ্যে দৌড়ে নামার ভূত চাপে। আমরা থাকি ইউনিভার্সিটির বাড়ির চারতলায়। দৌড়ে নামার সময় কি আছে আমাদের! কম্পন কমলে আমি বারান্দায় এসে দাঁড়াই। বাইরে ধূসর আলো, আকাশে অস্থির কা কা শব্দ, নিচে মানুষের জটলা।
কোথাও একটা শিশুর কান্নার আওয়াজ। দেখি আমাদের বিল্ডিংয়ের প্রায় সব বাসিন্দা নিচে নেমে গেছেন। ওপরেই থাকব না নিচে নামব—এই উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করি। আমি যে ভূমিকম্পের কথা বললাম তা তিন-চার মাস আগের। এরপর অন্তত আরও দুবার ভূমিকম্প হয়েছে দেশে। শেষবার হলো মাত্র কয়েক দিন আগে। সন্ধ্যার পরপর এই ভূমিকম্পের সময় আমাদের সব সন্তান জেগে আছে। পায়ের নিচটা সামান্য দুলছে দেখে আমি তাদের সাহস দেওয়ার জন্য বলি: ‘আর্থকোয়েক ডান্স করব আমরা এখন।’ এই রসিকতা নিশ্চয়ই পছন্দ হয়নি বিধাতার। হঠাৎ দেখি দুলুনি প্রবল হয়েছে, প্রবল থেকে প্রবলতর। বাচ্চারা চিৎকার করে ওঠে। আমিও তাদের সঙ্গে গলা মিলাই। জোরে জোরে আল্লাহর নাম নিই। আবারও নিচে মানুষের ভিড়! আমরা নামি প্রায় আধঘণ্টা পর, অন্য একটি কাজে।
নিচে তখনো কয়েকটি পরিবার। একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের স্ত্রী আমাদের বললেন: ‘আপনারা নামেননি কেন? টের পাননি?’ আমি বলি: ‘নেমে লাভ কী!’ আমাকে অবাক করে দিয়ে একজন হোমরাচোমরা অধ্যাপক বললেন: ‘দৌড়ে নেমে আসবেন। পারলে সিঁড়ির নিচে আশ্রয় নেবেন। সিঁড়ি সেফ!’ সিঁড়ি নাকি সেফ! আমরা দু-এক দিন ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজই হচ্ছে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করা।
আরও ভয়াবহ হচ্ছে সিঁড়ির নিচে আশ্রয় নেওয়া। ভূমিকম্প হলে প্রাণ বাঁচাতে সবচেয়ে জরুরি হলো ড্রপ, কাভার অ্যান্ড হোল্ড মেথড। ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে শক্ত কাঠের টেবিল বা উঁচু খাট বা চৌকির নিচে চলে যেতে হবে। মাথা আড়াল করতে হবে। তারপর টেবিল বা খাটের পা আঁকড়ে ধরতে হবে ভূমিকম্প পুরোপুরি না থামা পর্যন্ত। ঘুম ভেঙে কিছু না পেলে কমপক্ষে বালিশটা রাখতে হবে মাথার ওপর। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানী শিক্ষকেরাই যদি এটা না জানি, অন্যদের কী অবস্থা? আমি ঢাকা ট্রিবিউনে একজন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার পড়লাম এরপর।
ভূমিকম্প হলে নাকি ছুটে ঘর থেকে বের হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমাদের মনে থাকার কথা, আতঙ্কিত হয়ে ছুটে বের হতে গিয়ে দু-তিন মাস আগের ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ ছয়জন মানুষ। তারপরও আমাদের এই ব্যাপক অসচেতনতা কেন? আমাদের ফায়ার সার্ভিস নাকি কয়েক হাজার ভলান্টিয়ারকে ট্রেনিং দিয়েছে ভূমিকম্প হলে মানুষকে সাহায্য করার জন্য। তারা ভলান্টিয়ারদের কী শেখাচ্ছে কে জানে?
সবচেয়ে যা জরুরি প্রশ্ন, ভূমিকম্পের জন্য কতটা প্রস্তুত আছি আমরা? ভূমিকম্প-ঝুঁকি, ভূমিকম্প হলে করণীয়, এর পরের করণীয় সম্পর্কে কতটুকু জানি আমরা? ভূমিকম্প সবচেয়ে আনপ্রেডিক্টেবল, সবচেয়ে ভয়াবহ, সবচেয়ে অপরিচিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের জন্য। জনগণের করের টাকায় যাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগ করছেন, তাঁরা কী দায়িত্ব পালন করছেন এ বিষয়ে?
আলোর খবর
