Friday , October 12 2018
Breaking News

আপুদেরকে বলছি, মেহেদীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো জানেন তো?

মেহেদী হলো অধিকাংশ নারীর ঈদ আনন্দের একটি অংশ। হাত যদি মেহেদী রাঙা না হয়, তাহলে যেন ঈদের আনন্দটা একেবারেই ফিকে হয়ে যায়। কালের বিবর্তনে বাটা মেহেদীর জায়গা প্রায় দখল করে নিয়েছে প্যাকেটজাত মেহেদী। আর এসব মেহেদী সংরক্ষণ, কম সময়ে গাঢ় রঙ করার জন্য ব্যবহার করা হয় নানান রকম কেমিক্যাল; যা স্বাস্থ্য ও ত্বকের জন্য বেশ ক্ষতিকারক হতে পারে। এছাড়াও প্রাকৃতিক মেহেদীতেও অনেকের অ্যালার্জি সহ নানান ধরনের সমস্যা হতে পারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক মেহেদীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে।

মেহেদী সংরক্ষণের সময়সীমা, বিপুল পরিমাণে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এবং বিশ্বব্যাপী আদান-প্রদানের সুবিধার্থে কোম্পানিগুলো প্রাকৃতিক মেহেদীর সাথে রঙ এবং বিভিন্ন রকম দ্রাবক ব্যবহার করে থাকে। তাই মেহেদী লাগানোর পর যে গাঢ় রঙ হয়, তা আসলে মেহেদী নয় বরং সেসব দ্রাবক এবং রঙের মিশ্রণ। আর যদি এতে প্রাকৃতিক মেহেদী থেকেও থাকে, তাহলে এর মেয়াদ বহু আগেই উত্তীর্ণ হয়ে যায় বা কার্যকরী হয় না। এই সব কেমিক্যালগুলো অনিরাপদ এবং প্রায় সবগুলোই অবৈধ।

প্রক্রিয়াজাত মেহেদীর যত সমস্যা
বাজারে আজকাল যেসব টিউব মেহেদী পাওয়া যায়, সেগুলোতে নানান রকম ক্ষতিকর উপাদান যেমন গ্যাসোলিন, কেরোসিন, হালকা ধরনের ফ্লুয়িড, রঙ তরল করার কেমিক্যাল, বেনজিন (আলকাতরা থেকে উৎপন্ন করা বর্ণহীন তরল পদার্থ বিশেষ) এবং পিপিডি (প্যারা-ফিনাইলেনেডিইয়ামিন) থাকে। আর এই কেমিক্যালগুলো প্রায় সব কোম্পানিই অধিক হারে ব্যবহার করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ- পিপিডি কেমিক্যালটি সাধারণত চুলের রঙগুলোতে ব্যবহার করা হয় যাতে এর পরিমাণ থাকে মাত্র শতকরা ৩ ভাগ (প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে যেন তা ত্বকের সংস্পর্শে না আসে)।

অপরদিকে, প্রক্রিয়াজাত মেহেদীতে সাধারণত পিপিডি থাকে শতকরা ১০-৪০ ভাগ। আর এই পিপিডির জন্যই ত্বকে বড় বড় ফোসকা, স্থায়ী ক্ষত চিহ্ন বা দাগ, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি এমনকি জীবনের ঝুঁকিও থাকতে পারে।

পার্থক্যটা কীভাবে বুঝবেন
মোড়ক
প্রাকৃতিক মেহেদী আসলে মেহেদী প্রস্তুতকারীরা হাতেই তৈরি করে থাকেন। আর তা পচনশীল (রুমের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এটি মাত্র কয়েক দিনই ভালো থাকে) বলেই ফ্রিজে সংরক্ষণ করে রাখা ছাড়া বা বিদেশ থেকে কেনা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। কোণ বা টিউবে যেসব মেহেদী পাওয়া যায় সেগুলো বিশাল পরিমাণে কারখানায় প্রস্তুত করা হয়।

ঘ্রাণ
প্রকৃত এবং প্রাকৃতিক মেহেদীর ঘ্রাণ খুব সুন্দর হয়! এতে ঘাস বা খড়ের মতো ঘ্রাণ পাওয়া যায়। ঘ্রাণে সতেজতা আনতে সাধারণত এতে বিভিন্ন রকম প্রয়োজনীয় তেল ব্যবহার করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্যাজেপেট (এক জাতীয় সাদা রঙের ফুল), ল্যাভেন্ডার, লেমনগ্রাস, ইউক্যালিপ্টাস এবং টি ট্রি বা এই জাতীয় ঘ্রাণযুক্ত এসেনশিয়াল অয়েলগুলোই মেহেদীতে যোগ করা হয়।

সময়
গাঢ় রঙ পেতে প্রাকৃতিক মেহেদী ৪ ঘণ্টার চেয়ে বেশি সময় ধরে হাতে লাগিয়ে রাখতে হয় এবং মেহেদী শুকিয়ে ওঠানোর পর চব্বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত পানি লাগানো যাবে না। পুরোপুরি গাঢ় রঙ আস্তে সময় লাগে ৪৮ ঘণ্টা। যেসব মেহেদীতে অতিরিক্ত পরিমাণে কেমিক্যাল দেয়া থাকে সেগুলোর গায়ে প্রায়ই ‘ইন্সটা হেনা’ বা ‘ইমার্জেন্সি হেনা’ লেখা থাকে। এছাড়াও বলা থাকে যে, ত্রিশ মিনিট বা তার কম সময়ের জন্য তা ত্বকে রাখা যাবে এবং তোলার সময় পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

উপাদান
টিউব বা কোনের মেহেদীতে প্যাকেটের গায়েই উপাদানগুলো লেখা থাকে। সেক্ষেত্রে রূপবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে ব্যবহার করতে পারে। আর যদি প্রাকৃতিক মেহেদী ব্যবহার করেন, তবে বিশেষভাবে যার কাছ থেকে কিনবেন, তার কাছ থেকেও উপাদানগুলো এবং সেগুলোর কার্যকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জেনে নিবেন।

এক নজরে
মেহেদী পুরো হাতে বা পায়ে লাগানোর আগে হাতে অল্প একটু দিয়ে পরীক্ষা করে নিন, এতে আপনার কোনো রকম অ্যালার্জির সমস্যা হচ্ছে কিনা।
মেহেদী দেয়ার পর যদি চুলকানি, ত্বকে লালচে ভাব এবং ত্বকে জ্বালাপোড়া ভাব হলে সাথে সাথেই পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। অ্যালার্জির জন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করলে তা লাগিয়ে নিন। আর যদি অবস্থা খুবই খারাপ হয় তাহলে ঘরোয়া কোনো টোটকা যেমন তেল বা অন্য কিছু ব্যবহার না করে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

অ্যালার্জির সমস্যা
বাসায় বাটা মেহেদী ব্যবহার করলে সবচেয়ে ভালো। কারণ এতে কোনো ধরনের কেমিক্যাল থাকে না। তাই অ্যালার্জি সহ যেকোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। কম সময়ে মেহেদীর রঙ গাঢ় করার জন্য অনেক কোম্পানি পিপিডি ব্যবহার করে থাকে। অনেকেই এই বিষয়টি জানেন না যে, পিপিডি বেশ শক্তিশালী একটি অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান যা ত্বকে অ্যালার্জি জনিত প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে। সাধারণভাবে এতে যে ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- চুলকানি, লালচে ভাব, জ্বালাপোড়া ও ত্বকের কিছু অংশ ফুলে ওঠা।

চোখে লালচে ভাব
মেহেদী চোখের সংস্পর্শে আসলে চোখে লালচে ভাব হয়, এমনকি পানিও পড়তে পারে। এ ধরনের কোনো পরিস্থিতির শিকার হলে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চোখ পরীক্ষা করান। এছাড়াও মেহেদীর করা ঘ্রাণের কারণেও চোখে হাইপারসেন্সিটিভিটি রকমের সমস্যা হতে পারে। তবে তা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

আরবিসিএস (রেড ব্লাড সেলস্‌) এর ওপর প্রভাব পড়া
কিছু কিছু শিশুরা বিরল এক ধরনের সমস্যায় ভোগে; যাকে গ্লুকোজ-৬-ফসফেট ডিহাইড্রোজেনেজ (জিসিক্সপিডি) ডেফিশিইয়েন্সি বলা হয়। সেসব শিশুকে হাতে মেহেদী দেয়া থেকে বিরত রাখা উচিত। এই সমস্যা যদি থাকে, তাহলে মেহেদী দেয়ার পর রেড ব্লাড সেল ফেটে যায় এবং শারীরিক অবস্থার বেশ অবনতি ঘটে। আর যদি ভুলবশত মেহেদী দেয়ার পর শিশুর রেড ব্লাড সেল জনিত সমস্যা হয়, তাহলে জরুরী ভিত্তিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

পেটের সমস্যা
কোনভাবেই মেহেদী যেন পেটে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। কারণ তা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। যদি দুর্ঘটনাবশত পেটে মেহেদী চলেও যায়, তবে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। মেহেদী পেটে গেলে পেটে ব্যাথা, পেট খারাপ, বমি বা পেটের নানান রকম সমস্যা হতে পারে।

অন্যান্য সমস্যা
নাড়ি বা পাকস্থলীতে আলসার জাতীয় রোগ, অ্যামিবাস পরজীবীর কারণে সৃষ্ট প্রকট আকারে ডায়রিয়ার সমস্যা, ক্যান্সার, বর্ধিত প্লীহা, মাথা ব্যাথা বা ত্বকে হলদে ভাব বা জন্ডিস।

Facebook Comments